বেগম খালেদা জিয়া
তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী ও আপসহীন দেশনেত্রী
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও শৈশব
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আদি পৈতৃক ভিটা ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে। ডাকনাম 'পুতুল' হলেও শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত অথচ দৃঢ়চেতা। তাঁর পিতা ইস্কান্দর মজুমদার ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। দিনাজপুরের সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে উচ্চশিক্ষায় ব্রতী হন।
দাম্পত্য জীবন ও যুদ্ধদিন
১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সাথে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি থাকা সত্ত্বেও তিনি জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে দুঃসহ দিনগুলো পার করেন। স্বাধীনতার পর তিনি একজন আদর্শ গৃহিণী হিসেবে জীবনযাপন করলেও নিয়তি তাঁকে রাজনীতির বিশাল মঞ্চে নিয়ে আসে।
রাজনীতিতে অভিষেক
১৯৮১ সালে ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর দলের অস্তিত্ব রক্ষায় এবং জনগণের দাবির মুখে ১৯৮২ সালে তিনি রাজনীতিতে পদার্পণ করেন।
আপসহীন নেতৃত্ব ও আন্দোলন
এরশাদ বিরোধী দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনে বেগম জিয়া ছিলেন রাজপথের অকুতোভয় সেনানী। ১৯৮৩ সালে গঠিত সাত দলীয় জোটের নেত্রী হিসেবে তিনি স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। বহুবার তাঁকে কারাবরণ ও গৃহবন্দি হতে হয়েছে, কিন্তু তিনি কখনোই স্বৈরশাসকের সাথে আপস করেননি। এই অটল দৃঢ়তার কারণেই দেশের মানুষ তাঁকে 'আপসহীন নেত্রী' উপাধিতে ভূষিত করে।
সরকার গঠন ও উন্নয়নমূলক সংস্কার
১৯৯১ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তাঁর শাসনামলে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম হয়। তিনি শুধু রাজনীতি নয়, বরং শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন।
শিক্ষা সংস্কার
মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করেন, যা নারী শিক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ায় মডেল হিসেবে স্বীকৃত।
সামাজিক নিরাপত্তা
বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতার মতো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তাঁর হাতেই শুরু হয়।
পরিবেশ রক্ষা
দেশব্যাপী পলিথিন নিষিদ্ধকরণ এবং টু-স্ট্রোক ইঞ্জিন বন্ধের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় কঠোর সাহসী সিদ্ধান্ত নেন।
অর্থনৈতিক মুক্তি
ভ্যাট (VAT) প্রবর্তন এবং ক্ষুদ্র ঋণের প্রসার ঘটিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেন।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও শেষ দিনগুলি
২০০৮ পরবর্তী সময়ে তিনি নজিরবিহীন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন। তাঁর সেনানিবাসের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ, মিথ্যা মামলায় সাজা এবং সুদীর্ঘ কারাবাস তাঁর শারীরিক অবস্থাকে অবনতির দিকে নিয়ে যায়। তবে জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে থেকেও তিনি গণতন্ত্রের দাবি থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
উত্তরাধিকার
"বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন, তিনি কোটি কোটি বাংলাদেশীর হৃদয়ের স্পন্দন। তাঁর দেশপ্রেম এবং গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল আস্থা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাতিঘর হয়ে থাকবে। ইতিহাসে তিনি স্বমহিমায় ভাস্বর থাকবেন।"